ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ভোটের ফলাফল ঘোষণা ও নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগতে পারে তিন থেকে পাঁচদিন। ট্রানজিশনাল এ সময়ের পরপরই ১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে পারে রমজান মাস। নির্বাচন ও নতুন সরকার গঠনের এ অন্তর্বর্তী সময়ের মধ্যে জোরালোভাবে বাজার তদারক করা সম্ভব নাও হতে পারে। আর অসাধু ব্যবসায়ীরা এ সুযোগ নিতে পারেন—এমন শঙ্কার কথা উঠে এসেছে দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায়। এ অবস্থায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীদের নৈতিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, মজুদ, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের সঙ্গে গতকাল এফবিসিসিআইয়ের মতিঝিল কার্যালয়ে মতবিনিময় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান।
অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বিভিন্ন বাজার সমিতির নেতারা জানান, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে দেশে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে এবারের রমজানে এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নেই। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে চাঁদাবাজি রোধ করতে কর্তৃপক্ষকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তারা। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য ক্রয় করে বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করার জন্য সাধারণ ভোক্তাদের প্রতিও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তবে রমজানকে কেন্দ্র করে বাজার তদারকির নামে খুচরা ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানান ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের পক্ষে বাজার অস্থিতিশীল করা সম্ভব নয়।
এ বছর নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও বাজার নিয়ে শঙ্কার কথা জানান বাজার বিশ্লেষক এবং কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘এ বছর জ্বালানি সংকট দেখা দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রমজানে এ সংকট আরো বাড়তে পারে। এছাড়া রোজা শুরুর অল্প কিছুদিন আগেই জাতীয় নির্বাচন। এ সময় নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এ ট্রানজিশন পিরিয়ডে হয়তো জোরালোভাবে বাজার তদারকি করাও সম্ভব হবে না। কিছু অসাধু লোক এ সুযোগ নিতে পারে।’
বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আবুল হাশেম বলেন, ‘মিল মালিকরা ঠিকমতো জোগান দিতে পারলে বাজারে চিনির সংকট হবে না। করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে দেশে চিনি আমদানি করা গেলে ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতামূলক দামে চিনি বিক্রি করতে পারবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।’
শুধু খুচরা পর্যায়ে বাজার তদারকি না করে, বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ও আমদানিকারক পর্যায়ে সরকারের নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানান বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. গোলাম মাওলা।
এ সময় মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার তসলিম শাহরিয়ার বলেন, ‘রমজানের বাড়তি চাপ সামাল দেয়ার জন্য ভোজ্যতেল ও চিনির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে দেশে। তবে নির্বাচনকেন্দ্রিক ছুটির কারণে বন্দরে পণ্য খালাস, পরিবহন ও কাস্টমস কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’
রমজানে শাকসবজিসহ অন্যান্য কাঁচাপণ্যের বাজারও ভোক্তাদের নাগালে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন কাঁচাবাজার বণিক সমিতির নেতারা। তারা জানান, লেবু ছাড়া এ মুহূর্তে সব কাঁচা সবজির দাম স্বাভাবিক রয়েছে।
সভায় নিত্যপণ্যের চাহিদা, মজুদ, সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতির বর্তমান চিত্র তুলে ধরেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান। তিনি বলেন, ‘বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কাছে আমাদের অনুরোধ বাজারে সরবরাহ যেন বিঘ্নিত না হয়। বাজার তদারকি যেন ব্যবসায়ীদের উৎপাতের কারণ না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সজাগ থাকতে হবে।’
সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক মো. গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী ও খন্দকার রুহুল আমিন, মহাসচিব মো. আলমগীর, সেফটি কাউন্সিলের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শাহিদউল্লাহ, সাধারণ পরিষদের সদস্যরা, বিভিন্ন বণিক সমিতির নেতারা, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন, টিসিবি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।